যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার সূচকে চলমান ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই আবারো বাড়ছে শুল্কবিষয়ক অনিশ্চয়তা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নতুন ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্কনীতির সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে ৯ জুলাই। ফলে সপ্তাহজুড়েই হোয়াইট হাউজ থেকে কী বার্তা আসে সেদিকেই নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। কারণ এ সময়সীমা পার হলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারে। খবর রয়টার্স ও সিএনএন।
১ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার, যার মধ্যে কিছু হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন। এ ঘোষণা আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এখন শেষ মুহূর্তে নতুন চুক্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে তারা বাড়তি শুল্কের আওতায় না পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘প্রতিদিন ১০-১২টি দেশকে চিঠি পাঠানো হবে, যেখানে তাদের নতুন শুল্ক হার জানানো হবে। চিঠিগুলো তৈরি হয়ে গেছে, আগামীকাল থেকেই পাঠানো শুরু হবে।’
শুল্ক বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০-তে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এপ্রিলের শুরুর তুলনায় সূচকটি এখন পর্যন্ত প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারী ও কোম্পানিগুলোর নিজস্ব শেয়ার পুনঃক্রয়ের কারণে। তবে এ সময়ে বড় প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
মরগান স্ট্যানলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা লিসা শ্যালেট বলেন, ‘এটা এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বা স্পেকুলেটিভ প্রবৃদ্ধি। শেষ কয়েক সপ্তাহে কোম্পানিগুলো নয়, বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই বাজারে বেশি সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।’
ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখনো শেয়ারবাজারে বেশি সক্রিয় নন। তারা এখনো তাদের বিনিয়োগ বাড়াতে দ্বিধায় রয়েছেন। ফলে বাজারে এক ধরনের অপেক্ষা করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাই অন্যরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় আগে থেকেই ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এখন সে হার ৬০-৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। হোয়াইট হাউজ বলছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ভালোভাবে’ চুক্তি করতে পারছে না, তারাই মূলত নতুন এ শুল্কের মুখোমুখি হতে পারে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সীমিত পরিসরে চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছে। তবে ভারতের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে আলোচনা প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউজ আগে বলেছিল, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা করছে, তাদের জন্য সময়সীমা খুব কঠোর নয়। তবে শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগামী ১ আগস্ট থেকেই তারা শুল্ক পরিশোধ শুরু করবে।’
এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশ দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছতে চাইছে। ইইউর এক কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, ‘আলোচনা অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে আছে এবং সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যেও তা চালিয়ে যেতে হতে পারে।’
জনাস হেন্ডারসন ইনভেস্টরসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক জুলিয়ান ম্যাকম্যানাস বলেন, ‘আমি এ সময়সীমাকে কঠোর কোনো ডেডলাইন হিসেবে দেখছি না। বরং এটা ছিল বাজারের পতন ঠেকাতে নেয়া একটি সাময়িক ব্যবস্থা।’
তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ শুল্কনীতি বাস্তবায়ন হলে তার বেশকিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলে কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়ে দেবে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদহার নিয়ে আরো কঠোর নীতি নিতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিসিএ রিসার্চের প্রধান মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট আইরিন টাঙ্কেল বলেন, ‘হুমকি বা কড়া ভাষা থাকলেও এখনই এটা বাজারের জন্য বড় কোনো বিপদ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করি না।’
শেয়ারবাজারের আগের প্রবণতা থেকে বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাইয়ে সাধারণত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। ২০ বছরে সূচকটি এ মাসে গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তবে এবার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ ও শঙ্কা দুটোই একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে বাজারে মিশ্র মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
মরগান স্ট্যানলির শ্যালেট বলেন, ‘এখনই সময় কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার তারা কি শেয়ারবাজারের চলমান প্রবৃদ্ধিকে বিশ্বাস করবে, নাকি আরো সতর্ক অবস্থানে থাকবে।’
শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, বরং ব্যবসায়িক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এখন অনিশ্চয়তা কাজ করছে। যদি ৯ জুলাইয়ের সময়সীমা পার হয়ে যায় এবং বড় কোনো শুল্ক সংঘাত বা উত্তেজনা না ঘটে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ সময়সীমা পার হওয়াটাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এখনো স্পষ্ট নয় এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো সময় নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ‘আমরা ২০০টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারি না। তাই এখন সময় এসেছে, আমরা শুধু জানিয়ে দেব যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করতে হলে কে কত শুল্ক দেবে।’